
ছাম্মি আহমেদ আজমীর :
মানুষের পরিচয় তার মানবতায় এই চিরন্তন সত্যকেই যেন নীরবে ধারণ করে চলেছেন সিরাজগঞ্জের মো:জহির শেখ। একজন মুসলমান ধর্মের মানুষ হয়েও তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন ঘুড়কা পৌর মহাশ্মশানে। সিরাজগঞ্জ পৌরসভার মাস্টার রোল কর্মচারী হিসেবে নৈশ প্রহরীর দায়িত্বে থাকা এই মানুষটি দিন-রাত মহাশ্মশানের নিরাপত্তা ও যাবতীয় কাজ করে চলেছেন নিষ্ঠা সততা ও মানবিকতার সঙ্গে। ১৯৯৬ সাল থেকে শুরু হওয়া তার এই কর্মজীবনে অসংখ্য রাত কেটেছে শ্মশানের নীরবতা আর শোকাহত মানুষের কান্নার মাঝে। কখনো ভয়, কখনো সামাজিক কুসংস্কার কিছুই তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। দায়িত্ব আর মানবসেবাকেই তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা শ্রী বিজয় হরিজন বলেন,
মো: জহির শেখ দাদা শুধু একজন কর্মচারী নন তিনি মহাশ্মশানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের আস্থার প্রতীক। গভীর রাতেও কোনো মৃতদেহ মহাশ্মশানে এলে তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে সব কাজে সহযোগিতা করেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের শেষ বিদায়ের মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানোকে তিনি নিজের মানবিক দায়িত্ব মনে করেন।

এবিষয়ে মো:জহির শেখ এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,সনাতন ধর্মের মানুষের শেষ ঠিকানা এই মহাশ্মশান। এখানে কাজ করতে গিয়ে আমি বুঝেছি মৃত্যুর কাছে সব ধর্ম অহংকার আর ভেদাভেদ ছোট হয়ে যায়। আমি আমার দায়িত্বকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেই পালন করি। প্রায় ৩০ বছর ধরে এই মহাশ্মশানের সঙ্গে আমার আত্মার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। মানুষের দোয়া আর ভালোবাসাই আমাকে এই কাজ করার শক্তি দেয়।তিনি আরও বলেন,
অনেকে শুরুতে নানা কথা বলেছে। কিন্তু আমি কখনো খারাপ লাগা মনে রাখিনি। কারণ আমি বিশ্বাস করি মানুষের সেবা করাই সবচেয়ে বড় কাজ। রাতের পর রাত আমি এখানে দায়িত্ব পালন করেছি যেনো কোনো পরিবার তাদের প্রিয়জনের শেষ বিদায়ে কোনো সমস্যায় না পড়ে।
এবিষয়ে ঘুড়কা পৌর মহাশ্মশানের সভাপতি ভিপি অমর কৃষ্ণ দাস বলেন, মো: জহির শেখ আমাদের মহাশ্মশানের জন্য এক অনন্য সম্পদ। তিনি শুধু দায়িত্ব পালন করেন না নিজের পরিবারের সদস্যের মতো করে প্রতিটি কাজ দেখভাল করেন। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবতার যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আমরা তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

ঘুড়কা মহাশ্মশানের সাধারণ সম্পাদক সুকুমার চন্দ্র সরকার বলেন,আজকের সমাজে যেখানে সামান্য বিষয় নিয়েও বিভেদ সৃষ্টি হয় সেখানে মো: জহির শেখ প্রায় ৩০ বছর ধরে নিঃস্বার্থভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে এক অসাধারণ উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন মানবতাই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়। তার মতো মানুষ সমাজে সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার বার্তা ছড়িয়ে দেন। তিনি আরও বলেন, মো: জহির শেখ ভাই নামাজের সময় হলে মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। তিনি খুব আন্তরিক ও ভালো মনের মানুষ।
উল্লেখ্য, মো: জহির শেখের এই দীর্ঘ মানবিক দায়িত্ব পালন আজ অনেকের কাছেই অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। ধর্মীয় সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও মানবতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে তিনি নীরবে নিজের কাজ করে চলেছেন বছরের পর বছর।