
ছাম্মি আহমেদ আজমীর :
সিরাজগঞ্জ পৌর শহরের এলিয়ট ব্রিজ সংলগ্ন বড়পুলের সামনে এক টুকরো ইতিহাস যেন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৬৩ সাল থেকে এখানেই পত্রিকার ব্যবসা শুরু করেছিলেন প্রয়াত শামীম শেখ। সেই ছোট্ট স্টল ঘিরেই গড়ে উঠেছিল খবরের এক প্রাণবন্ত আসর যেখানে সকাল মানেই ছিল মানুষের ভিড় কাগজের পাতায় ছাপা দেশ-বিদেশের গল্প আর আলোচনার উচ্ছ্বাস।সময়ের স্রোতে বদলে গেছে দৃশ্যপট। সেই জমজমাট ভিড় এখন শুধুই স্মৃতি। বাবার সেই উত্তরাধিকার বুকে ধারণ করে ১৯৯৬ সাল থেকে আজও দাঁড়িয়ে আছেন তার বড় ছেলে মো:সেলিম শেখ। প্রতিদিন দোকান খুলে সাজান পত্রিকার বান্ডিল কিন্তু অপেক্ষা থাকে পাঠকের যারা এখন আর তেমন আসে না।ডিজিটাল যুগের সহজলভ্যতায় এখন খবর পৌঁছে যাচ্ছে মুহূর্তেই মানুষের হাতের মুঠোয়।স্মার্টফোনের পর্দায় ভেসে ওঠা খবর যেন ধীরে ধীরে সরিয়ে দিচ্ছে কাগজের পত্রিকাকে প্রান্তে। আর তাতেই জীবিকার এই পুরনো পথ হয়ে উঠেছে কঠিন প্রায় অনিশ্চিত।
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে পেপার বিক্রেতা মো:সেলিম শেখ বলেন,একসময় সকাল হলেই মানুষ পত্রিকা নিতে আসতো দোকানটা ছিল সরগরম। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকেন তেমন কেউ আসে না।সবাই মোবাইলেই খবর পড়ে নেয়। তবুও আমার প্রিয় বাবার স্মৃতি আর এই ব্যবসার প্রতি ভালোবাসা থেকেই এখনো ধরে রেখেছি। সরকারি, বেসরকারি চাকরি বিজ্ঞাপনের খবর থেকে শুরু করে বাংলাদেশের জনপ্রিয় পত্রিকা গুলো বিক্রি করে থাকি। আমাদের এখান থেকে চাকরি পত্রিকা কিনে আজ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর থেকে শুরু করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরি করছেন অনেক সৌভাগ্যবান ব্যক্তি। আমি সরকারের কাছে আবেদন করি আমার মতো এই অসহায় পেপার বিক্রেতাদের কে একটু খেয়াল রাখবেন এবং বিভিন্ন ভাবে সহোযোগিতায় করবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।
সাংবাদিক ছাম্মি আহমেদ আজমীর বলেন,সেলিম শেখের এই গল্প শুধু একজন মানুষের জীবিকার সংগ্রাম নয় এটি আমাদের সমাজের নীরব পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি ঠিকই কিন্তু কোথাও না কোথাও হারিয়ে ফেলছি আমাদের শিকড় আমাদের ঐতিহ্য। তবুও আশার কথা এই মাটির মানুষগুলোই আমাদের ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখে। সেলিম শেখের মতো মানুষের প্রতি আমাদের সহমর্মিতা ও সম্মান থাকা উচিত।
স্থানীয় পাঠক বাবু দেব বলেন,
কাগজের পত্রিকার আলাদা একটা গন্ধ আছে একটা অনুভূতি আছে যা মোবাইলের পর্দায় পাওয়া যায় না। ছোটবেলায় এই দোকান থেকে পত্রিকা কিনেছি অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আজও যখন সময় পাই ইচ্ছে করে তখন একটা পত্রিকা হাতে নিই। সেলিম ভাইয়ের মতো মানুষদের জন্যই এই ঐতিহ্য এখনো বেঁচে আছে। আমাদের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো।
উল্লেখ্য:মো: সেলিম শেখের এই সংগ্রাম শুধু একটি জীবিকার গল্প নয় এটি সময়ের পরিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসা এক ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি। যেখানে কাগজের পাতায় লেখা ইতিহাস আজ নীরবে জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে ডিজিটাল পর্দার ঝলমলে দুনিয়াকে আর পেছনে ফেলে যাচ্ছে কিছু অমলিন স্মৃতি আর এক বুক দীর্ঘশ্বাস।