শেখ মোঃ এনামুল হক,সিরাজগঞ্জ ব্যুরো চীফ : প্রত্যেক মানুষের জীবনের ‘গল্প’ আলাদা আলাদা । ভিন্ন তাদের সংকটের ধরনও। তাদের জীবন যেন একেকটা আলাদা ‘গল্প’ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। তবে বিএনপি নেতাকর্মীর সবার জীবনের ‘গল্পটা’ যেন একই রকমের। রাজনৈতিক বৈরী পরিবেশে মামলা-হামলায় জর্জরিত একেকটা জীবন যেন একেকটি ‘কষ্টগাথা’।
দলটির তৃণমূল থেকে শুরু করে একেবারে হাইকমান্ড পর্যন্ত প্রায় সবার বিরুদ্ধেই মামলার পাহাড়। এর মধ্যে প্রায় দেড় হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সম্প্রতি সাজার রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। নিয়মিত মামলার সঙ্গে এখন সাজার দণ্ড মাথায় নিয়ে ফেরারি জীবন পার করেছেন তারা। কবে নাগাদ আত্মসমর্পণ করে জামিন নেবেন, তা কেউ বলতে পারছেন না। কবে আবার মুক্ত জীবনে স্বাভাবিক নিয়মে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাবেন, তাদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকবেন, তাও কাহারো জানা ছিলোনা । বাবা-মা, ভাইবোন কিংবা সন্তানের ভালোবাসায় কবে সিক্ত হবেন, তাও অনিশ্চিত ছিল। এর বৈরী পরিবেশে মামলা-হামলায় মাথায় ৪৫টি রাজনৈতিক মামলা মাথায় নিয়ে ঘুরেছেন উল্লাপাড়া উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো: আজাদ হোসেন। এমন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেই আজাদ হোসেন এর মনোবলে চিড় ধরেনি। আজাদ হোসেন বলেছেন, দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে জাতীয়তাবাদী আদর্শের ধারক বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে এর থেকেও বেশি ত্যাগ স্বীকার করতে হচ্ছে। দেশের হাজার হাজার তৃণমূল কর্মী নিজেদের রক্ত দিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন, ঘরবাড়ি ছেড়ে উদ্বাস্তু জীবন পার করছেন। সেখানে এই আমার ফেরারি জীবনের কষ্ট তুলনামূলক কিছুই নয়। তবে এখান থেকেই তাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে। গণতন্ত্র আর ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনতে পারলে এই কষ্টময় জীবনের আমূল অবসান ঘটবে বলে তাদের বিশ্বাস।
কথা হয় সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার সদস্য সচিব মো: আজাদ হোসেন এর সঙ্গে। ৪৫টি মামলা মাথায় নিয়ে ফেরারি ছিল আজাদ হোসেন। স্বৈরাচারী সরকারের শাসনামলে ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ২৫বার কারাবরণ করেছে আজাদ হোসেন। তৎকালীন সময়ে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এর আদর্শ লালন করে এবং দেশমাতা বেগম খালেদা জিয়া উপর শ্রদ্ধা রেখে উল্লাপাড়াতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি সংগঠন নিজে হাতে লোকবল দিয়ে উল্লাপাড়া উপজেলাতে বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে মরহুম সরাফাত আলী। মরহুম সরাফাত আলীর ৫ সন্তানের মধ্যেই আজাদ হোসেন সবচেয়ে বড় ছেলে। আজাদ হোসেন ছাত্রজীবন থেকেই প্রত্যক্ষভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী বিএনপির সাথে সম্পৃক্ত। সর্বপ্রথম ১৯৮৭ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত উল্লাপাড়া উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৮সাল পর্যন্ত উল্লাপাড়া যুবদলের সভাপতি ও সিরাজগঞ্জ জেলা যুবদলে সহ সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আজাদ হোসেন উল্লাপাড়া পৌর বিএনপির আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত উল্লাপাড়া উপজেলা বিএনপির নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৫ সাল থেকে অদ্যবধি পর্যন্ত উল্লাপাড়া উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির নির্বাহী সদস্য এবং উল্লাপাড়া উপজেলা বিএনপির সদস্য নবায়ন, ইউনিয়ন ওয়ার্ড নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪৫টি রাজনৈতিক মামলায় ২৫বার জেল হাজতে প্রেরণ হয়েছে আজাদ হোসেন। প্রায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির রাজনৈতিক করতে গিয়ে উল্লাপাড়া বিএনপি নেতা আজাদ বছরের পর বছর ‘ফেরারি জীবন’ কেটেছে। বয়স ৭০ উর্দ্বে পেরোলেও নিজের ব্যক্তিগত জীবনটাও শুরু করতে পারেননি একের পর এক মামলার জটিলতায়। গত ১৭ বছরে তিনি বাড়ি যেতে না পাড়ায় বাড়ির রাস্তাই ভুলে গেছেন।
২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময়ে আজাদ হোসেন উল্লাপাড়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদ ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই ওই সময়ে উল্লাপাড়ায় পুরো আন্দোলনের ধাক্কা সামলাতে হয়েছে। সেখান থেকেই মামলার জীবন শুরু। ওই সময় থেকে বিভিন্ন মামলায় ২৫ বারের কারাবরণে প্রায় ৩ বছরের অধিক সময় কেটেছে কারাগারে। চলমান আন্দোলনেও তাঁর বিরুদ্ধে কমপক্ষে ২৫টি মামলা হয়েছে বিভিন্ন থানায়। এর আগে পুরোনো মামলায়ও আর হাজিরা দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে প্রায় প্রতিটি মামলাতেই ওয়ারেন্ট ইস্যু হয়েছে। এখন এসব মামলায় কবে হাজিরা দিয়ে, সাজার দণ্ড মাথায় নিয়ে আইনি প্রতিকার করবেন, তা তিনি নিজেও বলতে পারেন না।
আজাদ হোসেন বলেন, এই সরকারের আমলে নিগৃহীত হয়নি– বিএনপির এমন কোনো নেতাকর্মী পাওয়া যাবে না। এটা ছিল পুরো বাংলাদেশের চিত্র। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে মামলার রায় হয়েছে, সাজা দেওয়া হয়েছে, নিত্যনতুন মামলা দেওয়া হচ্ছে– সেটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেখানে খালেদা জিয়া আর তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সাজা দেওয়া হয়েছে, সেখানে তাঁর এই কষ্ট খুব সামান্যই।






