মোঃ আব্দুল কাদের
সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ
তাড়াশ কলেজ, তাড়াশ, সিরাজগঞ্জ।
গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি বন্দুকের নল বা ক্ষমতার প্রাসাদে নয়, বরং তা নিহিত থাকে একটি সাধারণ নাগরিকের নীরব সিদ্ধান্তে বা ভোটে। একটি ব্যালট পেপারের স্পর্শে নির্ধারিত হয় কোন ভূখন্ডের নৈতিক দিকনির্দেশ, ন্যায়বিচারের গতিপথ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভাগ্য। কিন্তু আমরা কি উপলব্ধি করি, এই ভোট কেবল একটি সাংবিধানিক অধিকারই নয়, এটি গভীর নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রতীক? আমাদের জনপরিসরে প্রায়ই উচ্চারিত হয়, “নেতারা দুর্নীতিগ্রস্ত, তাই রাষ্ট্র পিছিয়ে যাচ্ছে।”
কিন্তু এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত সত্যটি আমরা সচরাচর এড়িয়ে যাই। আসলে সেই নেতাদের ক্ষমতার আসনে বসায় কারা? গণতন্ত্রে এই প্রশ্নের উত্তর একমাত্র “ভোটার”। ফলে, প্রতিনিধির অন্যায়ের দায় থেকে ভোটার সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকতে পারেন না; বরং তিনি সেই প্রক্রিয়ার নীরব অংশীদার।
ভোট একটি নির্বাচন নয়, এটি একটি অনুমোদন যা একজন ব্যক্তির চরিত্র, আদর্শ, এবং ক্ষমতা প্রয়োগের নৈতিকতার প্রতি আত্বসম্মতি। অতএব, যখন কোনো অযোগ্য, দুর্নীতিগ্রস্ত বা অনৈতিক প্রার্থী আমাদের ভোটে নির্বাচিত হন, তখন তার প্রতিটি অন্যায় কার্যক্রমের নেপথ্যে আমাদের সিদ্ধান্তের ছাপ অনিবার্যভাবে থেকে যায়। গণতন্ত্রে অন্যায় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি সম্মিলিত নৈতিক বিচ্যুতির প্রতিফলন।
অন্যদিকে, নির্বাচিত প্রতিনিধির ওপর অর্পিত দায়িত্ব আরও গুরুতর। তিনি জনগণের প্রতিনিধি, জনবিশ্বাসের ধারক ও বাহক। তার হাতে ন্যস্ত ক্ষমতা কোনো ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, বরং একটি নৈতিক আমানত। এই আমানতের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে তাকে ন্যায়পরায়ণতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার আদর্শে অবিচল থাকতে হয়। কিন্তু বাস্তবতা প্রায়ই ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। কারণ, ক্ষমতা অনেক সময় জনসেবার পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থের উপকরণে পরিণত হয়।
সমস্যার গভীরতা আরও বৃদ্ধি পায় যখন দলীয় আনুগত্য নৈতিক বিবেচনাকে ছাপিয়ে যায়। “আমার দল” বনাম “তোমার দল”- এই সংকীর্ণ মানসিকতা আমাদের এমন এক অবস্থায় নিয়ে গেছে, যেখানে সত্য-মিথ্যার বিচার নয়, বরং স্বপক্ষের আনুগত্যই মুখ্য হয়ে ওঠে। এর ফলে অন্যায়কে আমরা প্রতিহত না করে বরং পরোক্ষভাবে প্রশ্রয় দিয়ে থাকি।
এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন আত্মসমালোচনা ও সচেতনতার নবজাগরণ। প্রথমত, ভোটারকে তার ভোটের নৈতিক তাৎপর্য অনুধাবন করতে হবে। প্রার্থীর সততা, যোগ্যতা ও জনকল্যাণে তার অঙ্গীকার- এসব বিষয় গভীরভাবে বিবেচনা করা ছাড়া ভোট দেওয়া মানে গণতন্ত্রকে কবরস্থানে নিক্ষেপ করা। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনের পর নাগরিকের ভূমিকা শেষ হয়ে যায় না; বরং সেখান থেকেই শুরু হয় প্রকৃত গণতান্ত্রিক দায়িত্ব। প্রতিনিধির কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি, প্রশ্ন ও সমালোচনার মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা নাগরিক কর্তব্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সংস্কৃতির নৈতিক পুনর্গঠন অপরিহার্য। রাজনীতি যদি কেবল ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে ন্যায়বিচার কখনো প্রতিষ্ঠিত হবে না। এটিকে পুনরায় জনসেবার আদর্শে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সর্বপরি, গণতন্ত্র নীরব পদ্ধতি হলেও এক দৃঢ় চুক্তি। কারণ, ভোটার তার বিবেকের মাধ্যমে ক্ষমতা অর্পণ করেন, আর প্রতিনিধি সেই ক্ষমতাকে ন্যায় ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করার অঙ্গীকার করেন। এই চুক্তি ভঙ্গ হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কেবল একটি সরকার বা জনপ্রশাসনই নয়, বরং পুরো জাতির নৈতিক ভিত্তি।
অতএব, সময় এসেছে প্রশ্ন করার। আমরা কেমন নেতা চাই? তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো আমরা কেমন ভোটার? কারণ, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- ন্যায় কিংবা অন্যায়ের সূচনা ঘটে ব্যালটের সেই নিঃশব্দ মুহূর্তেই।






