সোমবার, ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
সর্বশেষ
সিরাজগঞ্জ-রাজশাহী রুটে জেনিন ও এসআই পরিবহন চলাচল নিয়ে-মালিক-শ্রমিকদের দ্বন্দ্ব !
ভিক্টোরিয়া হাই স্কুলের এস.এস.সি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠান ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
পাবনা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশ বিশেষ অভিযানে অস্ত্রসহ গ্রেফতার-১
ভাঙ্গুড়া উপজেলায় মাদকসেবীকে বিনাশ্রম কারাদণ্ড সহ অর্থদণ্ড ভ্রাম্যমাণ আদালতের
ঈদুল আযহা সামনে রেখে সিরাজগঞ্জে মহাসড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিতে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত
সিরাজগঞ্জে বাংলাদেশ স্কাউটস,রোভার অঞ্চলের সিনিয়র রোভারমেট ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত
ঈদ বাড়তি আনন্দ,বড়লেখার ১৮ বাগানের ৪,৬৬৮ শ্রমিক পাচ্ছেন প্রায় ৪ কোটি টাকার বিশেষ ভাতা
জামায়াতে ইসলামী মৌলভীবাজার জেলা শাখার সদস্য সম্মেলন-২০২৬ অনুষ্ঠিত
উল্লাপাড়ায় বিএনপি নেতা আব্দুস সালাম এর জানাজা ও দাফন সম্পন্ন
সিরাজগঞ্জে ছাত্রদল নেতা কে নিয়ে “মেসি”লেখা ভাইরাল, নেট দুনিয়ায় চাঞ্চল্য

টাকার চশমায় অন্ধ বিসিক কর্মকর্তারা,উন্নয়ন নয়,চলছে টাকা লুটের উৎসব

ওয়াসিম সেখ,সিরাজগঞ্জ :

উত্তরাঞ্চলের শিল্পায়নের স্বপ্নকে সামনে রেখে নির্মাণাধীন সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্ক যেখানে গড়ে ওঠার কথা ছিল আধুনিক শিল্পনগরী, কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। শত কোটি টাকার এই প্রকল্প এখন অনিয়ম, দুর্নীতি আর নিম্নমানের কাজের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ? স্থানীয়দের ভাষায়, এখানে উন্নয়ন নয়, চলছে টাকা লুটের উৎসব!

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, শিল্পপার্কের অভ্যন্তরে নির্মিত সড়কগুলো ব্যবহার শুরুর আগেই বিভিন্ন স্থানে কার্পেটিং উঠে গেছে। কোথাও কোথাও সড়কের উপরিভাগে বড় বড় ফাটল, আবার কোথাও ইটের খোয়া বেরিয়ে পড়েছে। এমন চিত্র দেখে সহজেই অনুমান করা যায়, কাজের মান কতটা নিম্নমানের ছিল।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, সড়ক নির্মাণে নির্ধারিত ছিল ৫০ মিলিমিটার মানসম্মত পাথরের খোয়া ব্যবহার এবং ৭৫ মিলিমিটার পুরুত্বের কার্পেটিং। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অনেক জায়গায় পাথরের পরিবর্তে ভাঙা ইটের খোয়া ব্যবহার করা হয়েছে। কার্পেটিংয়ের পুরুত্বও ৬০ থেকে ৬৫ মিলিমিটারের বেশি নয়।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন,
রাস্তা বানানোর সময়ই বুঝছিলাম কাজ ঠিকমতো হচ্ছে না। এখন তো দেখছেন, গাড়ি ওঠার আগেই রাস্তা উঠে যাচ্ছে। এটা কোনো উন্নয়ন না, এটা সরাসরি জনগণের টাকার অপচয়।

আরেক বাসিন্দা রহিম শেখ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এখানে যারা কাজ করছে, তারা জানে কেউ তাদের ধরবে না। তাই যেভাবে পারছে টাকা তুলে নিচ্ছে।

প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী, শিল্পপার্কের লেকের দুই পাশে গাছ লাগানো এবং সমানভাবে বালু ভরাট করার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, লেকের এক পাশে কিছু গাছ লাগানো হলেও অপর পাশ পুরোপুরি ফাঁকা পড়ে আছে।

একজন স্থানীয় যুবক সোহেল রানা বলেন, কাগজে-কলমে দুই পাশেই গাছ লাগানো দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অর্ধেক কাজও হয়নি। এটা স্পষ্ট দুর্নীতি।

লেকের পাড়ে গিয়ে দেখা যায়, অনেক জায়গায় বড় বড় গর্ত রয়ে গেছে। বালু ভরাটের কাজ অসম্পূর্ণ, যা ভবিষ্যতে দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

শিল্পপার্কে গ্যাস লাইনের কাজেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পাইপলাইন বসানোর কাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি এখনো পানি সংযোগ স্থাপন না হওয়ায় সম্ভাব্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কার্যক্রম শুরু করতে পারছে না।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মনিরুজ্জামান বলেন,
এখানে যদি গ্যাস-পানি না থাকে, তাহলে শিল্প কারখানা কীভাবে চলবে? শুধু রাস্তা বানিয়ে তো শিল্পপার্ক হয় না।

অভিযোগ রয়েছে, সাবেক সরকারের সময় প্রভাবশালী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরাফাত কনস্ট্রাকশন দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমানের কাজ করে আসলেও বিসিক কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রতিষ্ঠানটিকে ২০২৪ সালের জুনে প্রায় ২০০ কোটি টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, সব কিছু জানার পরও বিল ছাড় করা হয়েছে। এটা একা ঠিকাদারের কাজ না, এর সঙ্গে ভেতরের লোকজনও জড়িত।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী। তার দাবি,
আমরা টেন্ডারের নিয়ম মেনেই কাজ করেছি। কোনো অনিয়ম হয়নি।

২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট শিল্পপার্ক এলাকা পরিদর্শনে যান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কিন্তু পরিদর্শনের সময় কোনো মাপজোক বা কার্যকর মূল্যায়ন করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, তারা শুধু ঘুরে চলে গেছেন। কোথাও কিছু মাপেননি। মনে হয়েছে দায়সারা পরিদর্শন।

এ বিষয়ে বিসিক চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম বলেন, রাস্তা উঠে যাচ্ছে এ বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে দুদক ও বিসিক তদন্ত করছে।

তবে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি, যা নিয়ে আরও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

২০২৫ সালের তথ্য অধিকার আইনের আওতায় প্রকল্পের বিভিন্ন তথ্য চেয়ে আবেদন করা হলে বিসিক শিল্প নগরীর ব্যবস্থাপক তথ্য দিতে লুকোচুরি পন্থা অবলম্বন করেন। স্থানীয় সাংবাদিক আশরাফুল ইসলাম বলেন,
জনগণের টাকায় করা প্রকল্পে ব্যবসায়িক গোপনীয়তা বলে কিছু থাকতে পারে না। এটা তথ্য গোপনের চেষ্টা।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ২০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। কিন্তু এখনো সেই টাকা আদায় করা হয়নি।

এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, যদি জরিমানা আদায়ই না করা হয়, তাহলে নিয়ম-কানুন থাকার মানে কী?

যমুনা সেতুর পশ্চিম পাশে প্রায় ৪০০ একর জমিতে গড়ে ওঠা এই শিল্পপার্ক প্রকল্পের ব্যয় একাধিকবার বৃদ্ধি পেয়ে এখন দাঁড়িয়েছে ৭১৯ কোটি ২১ লাখ টাকা। এখানে ৮২৯টি প্লটে অন্তত ৫৭০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয় সমাজকর্মী হাফিজুর রহমান বলেন, এই প্রকল্প আমাদের এলাকার উন্নয়নের জন্য ছিল। কিন্তু কিছু অসাধু কর্মকর্তা আর ঠিকাদারের কারণে সেটা এখন দুর্নীতির উদাহরণ হয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, দুদকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যদি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে, তাহলে সত্য বেরিয়ে আসবে।

সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্ক যে প্রকল্প একসময় ছিল উন্নয়নের প্রতীক, এখন তা দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিম্নমানের কাজ, অসম্পূর্ণ অবকাঠামো, তথ্য গোপন এবং তদন্তে গড়িমসি সব মিলিয়ে প্রকল্পটি এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এমন বড় প্রকল্পে যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে দেশের শিল্পখাতের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।

এখন দেখার বিষয় অভিযোগের এই পাহাড় ভেঙে সত্য বেরিয়ে আসে কিনা, আর দায়ীদের বিরুদ্ধে আদৌ কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় কিনা।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০